নামাজের ভুল সমুহ । জামাতে নামাজ পড়ার নিয়ম

913
নামাজের ভুল সমুহ

নামাজের ভুল সমুহ

মুসলিম হিসেবে সবচাইতে জরুরি কাজ সালাত আদায় করা। নামাজের ভুল সমুহ এবং জামাতে নামাজ পড়ার নিয়ম মেনে সালাতের ফরয, ওয়াজিব, সুন্নাহ এবং সালাতের পূর্বাপর বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে যথাসম্ভব নির্ভুল পদ্ধতিতে আদায় করা একজন মুমিনের অতিব জরুরী।

তাড়াহুড়া করে ওযু করা:
জামাতে শরীক হওয়ার জন্যে তাড়াহুড়া করে ওযু করার কারণে অনেক সময় কোন কোন স্থানে পানি পৌঁছে না। নামাজের ভুল সমুহ শুকনো রয়ে যায় কিছু কিছু অঙ্গের পানি পৌছায় না অথচ কোন স্থান শুকনো থেকে গেলে সেই ওযু দিয়ে সালাত বিশুদ্ধ হবে না।

পেশাব ও পায়খানার চাপ রেখে সালাত আদায় করা:
রাসূল বলেন, খাদ্য উপস্থিত হলে এবং দুটি নাপাক বস্তুর (পেশাব-পায়খানা) চাপ থাকলে সালাত হবে না।’ (মুসলিম হা/৮৬৯)

দৌড়িয়ে সালাতে শরীক হওয়া:
ইমামের সাথে তাকবীরে তাহ্রীমা পাওয়ার জন্য বা রুকু পাওয়ার জন্য দৌড়িয়ে বা দ্রুত হেঁটে সালাতে শামিল হওয়া যাবে না। এটা নিষিদ্ধ। রাসূল বলেন, যখন সালাতের ইক্বামত প্রদান করা হয় তখন তাড়াহুড়া করে সালাতের দিকে আসবে না। বরং ধীর-স্থির এবং প্রশান্তির সাথে হেঁটে হেঁটে আগমন করবে। অতঃপর যতটুকু অংশ পাবে তা আদায় করবে। আর যা ছুটে যাবে তা (ইমামের সালামের পর) পূর্ণ করে নিবে।’ (বুখারী হা/৮৫৭ ; মুসলিম)

জুম্মার নামাজ কি । জুম্মার নামাজ কত প্রকার ও কি কি

কাতারে আঁকাবাঁকা অথবা ফাঁকা ফাঁকা হয়ে দাঁড়ানো:
নুমান বিন্ বাশীর (রা:) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল নিয়মিত আমাদের কাতারগুলো সোজা করতেন যেন তিনি তীর সোজা করছেন। যতক্ষণ না তিনি বুঝলেন, আমরা ব্যাপারটি বুঝে ফেলেছি। একদা তিনি নামাযের তাকবীর দিবেন দিবেন এমতাবস্থায় দেখলেন, জনৈক সাহাবীর ছাতি অন্যদের তুলনায় একটু সামনের দিকে বের হয়ে আছে তখন তিনি সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন: ‘তোমরা নামাযের কাতারগুলো সোজা করবে। নয় তো আল্লাহ্ তাআলা তোমাদের মাঝে ভিন্নতা সৃষ্টি করবেন।’ (বুখারী হা/৭১৭, মুসলিম হা/৪৩৬)

অন্য হাদিস – আনাস ইবনে মালিক (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ বলেছেন: তোমরা কাতারের মধ্যে পরস্পর মিলে মিশে দাঁড়াও, এক কাতার অপর কাতারের নিকটে করো এবং কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াও। যার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ! আমি শয়তানকে নামাযের কাতারের মধ্যে বকরীর ন্যায় প্রবেশ করতে দেখেছি। (আবু দাউদ হা/৬৬৭, নাসাঈ)

সিজদার স্থানে দৃষ্টিপাত করা:
আকাশের দিকে বা অন্য দিকে দৃষ্টিপাত করার ফলে সালাতে ভুল হয়ে যায় এবং মনের মাঝে নানা কথার সৃষ্টি হয়। অথচ দৃষ্টি নীচে রাখা এবং সার্বক্ষণিক দৃষ্টি সিজদার স্থানে রাখার জন্য নির্দেশ রয়েছে। নবী বলেন, ‘কিছু লোকের কি হয়েছে, তারা সালাতরত অবস্থায় আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করে?’ তারপর তিনি কঠোর শব্দ উচ্চারণ করে বলেন, ‘তারা হয় এ থেকে বিরত হবে, নইলে তাদের দৃষ্টি শক্তি ছিনিয়ে নেয়া হবে।’ (মুসলিম ; মিশকাত হা/৯৮৩)

সালাত অবস্থায় ডানে-বামে তাকানো:
সালাত অবস্থায় ডানে-বামে দৃষ্টিপাতের ব্যাপারে নবী -কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা হচ্ছে বান্দার সালাত থেকে কিছু অংশ শয়তানের ছিনিয়ে নেয়া।’ (বুখারী ; মিশকাত হা/৯৮২)

বিনা কারণে চোখ বন্ধ করে সালাত আদায় করা:
ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ্মাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, ‘সালাত অবস্থায় দু’চোখ বন্ধ রাখা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হিদায়াত বহির্ভূত কাজ।

কুরআন তেলাওয়াত:
তাকবীর, কুরআন তেলাওয়াত ও সালাতের অন্যান্য দুআর সময় ঠোঁট না নাড়িয়ে শুধু মনে মনে বলা এটি একটি বহুল প্রচলিত ভুল। ইমাম নববী (রহ্মাতুল্লাহি ‘আলাইহি) বলেন, ‘ইমাম ছাড়া অন্য সবার সর্বনিম্ন সীমা হচ্ছে নিজেকে শোনানো- যদি তার শ্রবণ শক্তি ঠিক থাকে এবং কথায় কোন জড়তা না থাকে। এ বিধান সকল ক্ষেত্রে ক্বিরাত পাঠ, তাকবীর, রুকু, সিজদার তাসবীহ প্রভৃতি।’ তাছাড়া ঠোঁট না নাড়ালে তো সেটাকে পড়া বলা চলে না। কারণ আরবীতে এমন অনেক অক্ষর আছে ঠোঁট না নাড়ালে যার উচ্চারণই হবে না।

তাকবীর দেওয়ার সময় হাত উত্তোলন:
অনেককে দেখা যায় তাকবীর দিয়ে হাত দুটি উত্তোলনের সময় হাতের তালু বাঁকা রাখেন, অথবা কান ধরেন। অথচ হাতের তালুদ্বয় ক্বিব্লামুখী রাখাটাই সুন্নাহ। দুহাত ওঠানোর সময় রাসূলুল্লাহ আঙ্গুলগুলোকে প্রসারিত অবস্থায় ওঠাতেন। তবে আঙ্গুলের মাঝে তিনি ফাঁক রাখতেন না এবং একেবারে মিলিয়েও দিতেন না। কিন্তু কান স্পর্শ করার দলিল কোথাও পাওয়া যায় না।

তাহাজ্জুদ নামাজ কি? কখন পড়া উত্তম এবং পড়ার গুরুত্ব

সূরা পাঠ:
সলাতে সূরা পাঠ বিশেষ করে সূরা ফাতিহা পাঠ করার সময় আয়াতসমূহের শেষে ওয়াক্বফ্ করা অর্থাৎ প্রতি আয়াতে থেমে থেমে সূরা পাঠ করা সুন্নাত। (আবু দাউদ, সাহমী (৬৪-৬৫) হাকিম এটিকে সহীহ বলেছেন ও যাহাবী তার সমর্থন করেছেন। এছাড়াও সূরা পাঠ শুদ্ধ করে পড়া সকলের উপর ফরয।

রুকু প্রসঙ্গে:
রাসূলুল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কারো সলাত ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হবে না যতক্ষণ না আল্লাহ্র নির্দেশ অনুযায়ী ভালভাবে ওযূ করবে অতঃপর আল্লাহু আক্বার বলে তাঁর প্রশংসা ও মহত্বের গুণকীর্তন করবে এবং কুর’আন থেকে আল্লাহ্র শিখানো ও অনুমোদিত অংশ হতে যা সহজ তা পাঠ করবে। অতঃপর তাকবীর বলে রুকু করবে ও এমতাবস্থায় স্বীয় হস্তদ্বয় উভয় হাঁটুর উপর স্থাপন করবে- যাতে দেহের জোড়াগুলো শান্তশিষ্ট ও স্থির হয়ে যায়।

রুকু ও সাজদায় প্রশান্তি ও ধীর-স্থিরতা অবলম্বন না করা:
দেখা যায়, অনেক মানুষ তাড়াহুড়া করে সালাত আদায় করতে গিয়ে ভালভাবে রুকু-সিজদা করে না। রুকুর সময় পিঠ সোজা না করে মাথাটা একটু নিচু করে। মোরগের ঠোকর দেয়ার মত করে সিজদা করে। অথচ এভাবে সালাত আদায়কারীকে হাদিসে নিকৃষ্ট চোর বলা হয়েছে। (আহ্মাদ ; মিশকাত হা/৮৮৫) আর তার সালাতও বিশুদ্ধ হবে না।

সালাতে সিজদা করার সময় সাতটি অঙ্গ পরিপূর্ণরূপে মাটিতে না রাখা:
আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাতটি অঙ্গের উপর সিজদা করতে আদিষ্ট হয়েছেন। মুখমণ্ডল (নাক ও কপাল), দুই হাত, দুই হাঁটু ও দুই পা। (বুখারী ; মিশকাত হা/৮৮৭) কিছু লোক সিজদা করার সময় দু’টি পা সামান্য একটু উঠিয়ে রাখে বা এক পা অন্যটির উপর রাখে। বরং সুন্নাহ হচ্ছে দু’পায়ের আঙ্গুলসমূহ কিবলামূখী করে রাখা। অনুরূপভাবে কেউ কেউ শুধু কপাল মাটিতে রাখে, নাক রাখে না। এরূপ করা সুন্নাহের পরিপন্থী।

সালাম ফিরানো:

দুদিকে সালাম ফিরানোর সময় মাথা ঝাঁকানো বা পরিপূর্ণ ভাবে চেহারা না ঘুরানো: লক্ষ্য করা যায় কিছু মুসল্লী সালাম ফিরানোর সময় মাথাটা একটু উপর দিকে উঠিয়ে আবার নীচে নামায়। আবার অনেকে মাথা সম্পূর্ণভাবে ডান ও বাম দিকে ঘুরায় না। ‘রাসূলুল্লাহ ডান দিকে সালাম ফিরানোর সময় বলতেন, আস্-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহ্মাতুল্লাহ। সে সময় তাঁর ডান গালের শুভ্র অংশ পিছন থেকে দেখা যেত। আর বাম দিকে সালাম ফিরানোর সময় বলতেন, আস্-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহ্মাতুল্লাহ। সে সময় তাঁর বাম গালের শুভ্র অংশ দেখা যেত। (তিরমিযী, নাসাঈ, আবু দাউদ, মিশকাত হা/৯৫০, সনদ সহীহ)

নামাজের ফরজ, সুন্নত, ওয়াজিব ও মুস্তাহাব

সরাসরি ইমামের সাথে সালাতে শরীক না হয়ে অপেক্ষা করা:
নামাজের ভুল সমুহ – ইমাম সিজদায় থাকলে বসার অপেক্ষা করা বা বসাবস্থায় থাকলে দাঁড়ানোর অপেক্ষা করা। তিনি যখন দাঁড়াবেন বা রুকু’তে যাবেন তখন তাঁর সাথে সালাতে শামিল হওয়া। এটা সুন্নাত বহির্ভূত কাজ। বরং ইমাম যে অবস্থাতেই থাকুন তার সাথে সালাতে শরীক হতে হবে।

ইমামের আগে কোন কাজ করা:
ইমামের আগেই রুকু’ সিজদা করা বা দাঁড়িয়ে পড়া ইত্যাদি। তাড়াহুড়া করতে গিয়ে অনেকে এরূপ করে ফেলে। অথচ উচিত ছিল ধীরস্থিরভাবে ইমামের পরে পরে এ সমস্ত কাজ করা। কেননা, এক্ষেত্রে হাদিসে কঠিন নিষেধাজ্ঞা এসেছে। একটি বিশেষ সতর্কতার বিষয় হল, সালাম ফিরানোর সময় ইমামের সালাম ফিরানো শেষ করার পর মুক্তাদি সালাম ফেরাবে।

সালাতরত ব্যক্তির সামনে দিয়ে হাঁটা চলা করা:

এ বিষয়ে অনেক মানুষ শিথিলতা প্রদর্শন করে থাকে। অথচ এক্ষেত্রে কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। আবুল জুহাইম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন, সালাতের সম্মুখ দিয়ে অতিক্রমকারী যদি জানত এতে কি পরিমাণ পাপ রয়েছে, তবে তার সম্মুখ দিয়ে অতিক্রম করার চাইতে চল্লিশ (দিন/মাস/বছর) দাঁড়িয়ে থাকা উত্তম হত। হাদিসের বর্ণনাকারী আবু নযর বলেন, আমার মনে পড়ে না- চল্লিশ দিন না চল্লিশ মাস না চল্লিশ বছর বলেছেন।

ফরয সালাতের এক্বামত হওয়ার পরও নফল বা সুন্নাত আদায় করতে থাকা:
অনেক মানুষ সুন্নাত বিরোধী এ কাজটি করে থাকে। আবু হুরায়রাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল বলেছেন, ‘যখন সালাতের ইক্বামত দিয়ে দেয়া হয়, তখন সেই ফরয সালাত ব্যতীত আর কোন সালাত নেই।’
ইবনু হযম (রহ্মাতুল্লাহি আলাইহি) বলেন, ফরয সালাতের ইক্বামত হয়ে যাওয়ার পর যদি কেহ সুন্নাত সালাত শুরু করে, আর এ কারণে তার তাকবীর বা এক রাকাত ছুটে যায় তবে উক্ত সুন্নাত শুরু করা তার জন্য জায়েয নয় এবং এ অবস্থায় সে আল্লাহ্র নাফরমান বলে গণ্য হবে।
অতএব, যখনই জামাআতে সালাত চলমান দেখবে তখনই মুসল্লীর কর্তব্য হল কোন প্রকার সুন্নাতের নিয়ত না করে সঙ্গে সঙ্গে জামাআতে শরীক হয়ে যাওয়া।

Buy Now: Smart Wifi 6 Quart Multi-use Electric Pressure

সালাতরত অবস্থায় হাই প্রতিরোধ না করা:
রাসূল বলেন, তোমাদের কোন ব্যক্তির সালাত অবস্থায় যদি হাই আসে তবে সাধ্যানুযায়ী তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করবে। কেননা ঐ অবস্থায় শয়তান ভিতরে প্রবেশ করে। (মুসলিম হা/৫৩১৩) এটা প্রতিরোধ করার পদ্ধতি হচ্ছে, ঐ অবস্থায় মুখে হাত দেয়া।

টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা ও সিজদায় কাপড় উপরে উঠে যাওয়া:

রাসূলুল্লাহ বলেছেন: ৩ প্রকার লোকের সাথে আল্লাহ্ তাআলা ক্বিয়ামতের দিন কথা বলবেন না। তাদেরকে পবিত্র করবেন না; বরং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণা দায়ক শাস্তি। তারা হল টাখনুর নীচে কাপড় (অন্য বর্ণনায় লুঙ্গি) পরিধান কারী, খোঁটা দানকারী (অন্য বর্ণনায় এসেছে যে খোঁটা না দিয়ে কাউকে কোন কিছু দান করে না) ও মিথ্যা শপথের সাহায্যে পণ্য সামগ্রী বিক্রয়কারী।

এছাড়াও দেখা যায় যে,কিছু কিছু মুসল্লি ভাইয়েরা এতো ছোট,আঁটোসাঁটো শার্ট/গেঞ্জি পড়ে সালাত আদায় করেন যে সিজদায় গেলে তাদের কাপড়ের পেছনের অংশ উপরে উঠে যায় এবং যার ফলে তাদের সতর ভঙ্গ হয়,যেটা দৃষ্টিকটু এবং মহান আল্লাহ তায়ালার সামনে যারপরনাই বেয়াদবি। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা আমাদের বিশুদ্ধ ও সুন্নাহ মোতাবেক সালাত আদায়ে সাহায্য করুন।আমিন।