পবিত্র ঈদের দিনে আমাদের কি করনীয় এবং কি বর্জনীয়

1409
পবিত্র ঈদের

পবিত্র ঈদের দিনে আমাদের কি করনীয়

পবিত্র ঈদের দিনে আমাদের কি করনীয় এবং কি বর্জনীয় তা নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করা হলো।

ঈদ আরবী শব্দ। এটা আরবী শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। যার অর্থ ফিরে আসা। ঈদের দিনটি বার বার ফিরে আসে বলে এটাকে ঈদ বলা হয় ।

ইসলামে ঈদের প্রচলন:

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মুসলিম উম্মাহর প্রতি রহমত হিসেবে ঈদ দান করেছেন। হাদীসে এ এসেছেঃ

‘রাসুল (সাঃ) যখন মদিনাতে আগমন করলেন তখন মদিনা বাসীদের দুটো দিবস ছিল, যে দিবসে তারা খেলাধুলা করত।রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন এ দু দিনের কি তাৎপর্য আছে? মদিনা বাসীগণ উত্তর দিলেন : আমরা মূর্খতার যুগে এ দু দিনে খেলাধুলা করতাম।
তখন রাসূলে করীম (সাঃ) বললেন : ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ দু দিনের পরিবর্তে তোমাদের এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ দুটো দিন দিয়েছেন। তা হল ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর। (আবু দাউদ : ৯৫৯)

শুধু খেলাধুলা, আমোদ-ফুর্তির জন্য যে দুটো দিন ছিল আল্লাহ তাআলা তা পরিবর্তন করে এমন দুটো দিন দান করলেন যে দিনে আল্লাহর শুকরিয়া, তার যিকির, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার সাথে সাথে বৈধ আমোদ-ফুর্তি, সাজ-সজ্জা, খাওয়া-দাওয়া করা হবে।

পবিত্র ঈদের দিনে করণীয়

(১) গোসল করা

(২) পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা

(৩) সুগন্ধি ব্যবহার করা।

ঈদের দিন গোসল করার মুস্তাহাব।
হাদীসে এসেছে,

ইবনে উমার রা. থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত যে তিনি ঈদুল-ফিতরের দিনে ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে গোসল করতেন।সায়ীদ ইবনে মুসাইয়াব রহ. বলেন : ঈদুল ফিতরের সুন্নত তিনটি : ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া, ঈদগাহের দিকে রওয়ানার পূর্বে কিছু খাওয়া, গোসল করা।এমনিভাবে সুগন্ধি ব্যবহার ও উত্তম পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব। হাদীসে এসেছে,

আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. থেকে বর্ণিত যে, উমার রা. একবার বাজার থেকে একটি রেশমি কাপড়ের জুব্বা আনলেন ও রাসূলে করীম (সাঃ) কে দিয়ে বললেন : আপনি এটা কিনে নিন। ঈদের সময় ও আগত গণ্যমান্য প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাতে পরিধান করবেন। রাসূলে করীম (সাঃ) বললেন : ‘এটা তার পোশাক যার আখেরাতে কোন অংশ নেই।’( বুখারী : ৯৪৮)

এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হল রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ঈদের দিনে উত্তম পোশাক পরিধান করার প্রয়োজনীয়তার প্রতি সম্মতি দিয়েছেন। আর উক্ত পোশাকটি রেশমি পোশাক হওয়ায় তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। কেননা, ইসলামী শরীয়তে পুরুষদের রেশমি পোশাক পরিধান জায়েয নয়।

ইবনে উমার রা. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত যে তিনি দু ঈদের দিনে সুন্দরতম পোশাক পরিধান করতেন। (বায়হাকী : ১৯০১)

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেছেন: নবী করীম (সাঃ) দু ঈদেই ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে সুন্দরতম পোশাক পরিধান করতেন।এ দিনে সকল মানুষ একত্রে জমায়েত হয়, তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত হল তার প্রতি আল্লাহর যে নেয়ামত তা প্রকাশ ও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার লক্ষে নিজেকে সর্বোত্তম সাজে সজ্জিত করা। হাদীসে এসেছে,

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার বান্দার উপর তার প্রদত্ত নেয়ামতের প্রকাশ দেখতে পছন্দ করেন।’ (সহীহ আল-জামে হাদীস নং ১৮৮৭)

(৪) ঈদুল ফিতরের দিন সালাতে বের হওয়ার আগে আহার করা:
আনাস ইবন মালিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু খেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেজুর না খেয়ে বের হতেন না। অপর এক বর্ণনায় আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু নবী (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি তা বেজোড় সংখ্যক খেতেন।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৯৫৩)

(৫) পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া
ঈদগাহে তাড়াতাড়ি যাওয়া উচিত। যাতে ইমাম সাহেবের নিকটবর্তী স্থানে বসা যায় ও ভালো-কাজ অতি তাড়াতাড়ি করার সওয়াব অর্জন করা যায়, সাথে সাথে সালাতের অপেক্ষায় থাকার সওয়াব পাওয়া যায়। ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া হল মুস্তাহাব।
হাদীসে এসেছে,

আলী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ‘সুন্নত হল ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাওয়া।’ ইমাম তিরমিযী হাদিসটি বর্ণনা করে বলেন হাদিসটি হাসান। তিনি আরো বলেন : অধিকাংশ উলামায়ে কেরাম এ অনুযায়ী আমল করেন। এবং তাদের মত হল পুরুষ ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যাবে, এটা মুস্তাহাব। আর গ্রহণযোগ্য কোন কারণ ছাড়া যানবাহনে আরোহণ করবে না। (তিরমিযী : ১৮৭)

(৬) ঈদগাহে এক রাস্তায় যাওয়া অন্য রাস্তায় ফিরে আসা।
যে পথে ঈদগাহে যাবে সে পথে না ফিরে অন্য পথে ফিরে আসবে। যেমন হাদীসে এসেছে,

জাবের রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন : ‘নবী করীম (সাঃ) ঈদের দিনে পথ বিপরীত করতেন।’ (বুখারী : ৯৩৩ )
অর্থাৎ যে পথে ঈদগাহে যেতেন সে পথে ফিরে না এসে অন্য পথে আসতেন।
রাস্তা দুটি থাকলে এক রাস্তা দিয়ে যাবে আর এক রাস্তা দিয়ে আসবে আর যদি রাস্তা একটিই হয় তাহলে একপাশ দিয়ে যাবে আর অন্য পাশ দিয়ে আসবে।

(৭) ঈদের তাকবীর আদায়
ঈদের দিন তাকবীর পাঠ , শেষ রোযার দিন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর থেকে ঈদের নামায শুরু হওয়া পর্যন্ত তাকবীর পাঠ করা বিধেয়। এর দলীল মহান আল্লাহর স্পষ্ট বাণীঃ

অর্থঃ যেন তোমরা নির্ধারিত সংখ্যা পূরণ করে নিতে পার এবং তোমাদেরকে যে সুপথ দেখিয়েছেন তার জন্য তোমরা আল্লাহর তাকবীর পাঠ কর এবং যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার। (সুরা বাকারাহ-১৮৫)

এই তাকবীর পুরুষের জন্য মসজিদে, ঘরে, বাজারে ও রাস্তা-ঘাটে উচ্চস্বরে পাঠ করা সুন্নত। মহিলারাও এই তকবীর পাঠ করবে, তবে নিম্নস্বরে। যাতে গায়রে মাহরাম কোন পুরুষ তার এই তাকবীর পাঠের আওয়াজ শুনতে না পায়।
ঈদগাহের দিকে বের হওয়া থেকে শুরু করে ইমাম আসার আগে পর্যন্ত উক্ত তাকবীর পাঠ করা বেশী গুরুত্তপূর্ণ। যখন সালাত শেষ হয়ে যায় তখন আর তাকবীর পড়বে না।
মহানবী (সাঃ) উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করতে করতে উভয় ঈদে বের হতেন। (সহীহুল জামেইস সাগীর, আলবানী ৪৯৩৪ নং)
ইবনে উমার রা. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে ঈদগাহে আসা পর্যন্ত উচ্চস্বরে তাকবীর পাঠ করতেন। ঈদগাহে এসে ইমামের আগমন পর্যন্ত এভাবে তাকবীর পাঠ করতেন।

 

তকবীরের শব্দাবলী

আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তাকবীরঃ

‘আল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার, লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হাম্দ। ( মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবাহ, ৫৬৫০, ৫৬৫২)

আবদুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তাকবীরঃ

আল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার আল্লা-হু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হাম্দ। আল্লা-হু আকবার ওয়া আজাল,ø আল্লাহু আকবার আলা মা হাদা-না। (বাইহাকী ৩/৩১৫, ইরওয়াউল গালীল, ৩/১২৫)

অন্য এক বর্ণনায় আছে,

‘ আল্লা-হু আকবার কাবীরা, আল্লা-হু আকবার কাবীরা, আল্লা-হু আকবার ওয়া আজাল্ল আল্লা-হু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হাম্দ। (ইবনে আবী শাইবাহ, মুসান্নাফ ৫৬৪৫, ৫৬৫৪, ইরওয়াউল গালীল, ৩/১২৫)

আরো জানুন : হাশরের ময়দানে দাঁড়িপাল্লায় সবচেয়ে ভারী জিনিষের একটি সুন্দর চরিত্র